বিশ্বনাথ প্রতিনিধিঃ সিলেটের বিশ্বনাথে একইদিনে ঘটলো দুটি স্মরণীয় ঘটনা—একদিকে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালিত হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম উৎসব ‘শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব’, অন্যদিকে অশ্রুসিক্ত চোখে চিরবিদায় জানানো হলো মরমী বাউল সাধক ও অমর গীতিকার খোয়াজ মিয়াকে।
শুক্রবার (২৭ জুন) ব্রহ্ম মুহূর্তে পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘জাগ্রত শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য পরিষদ’ আয়োজিত চতুর্থবারের মতো ‘শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা মহোৎসব’। বিশ্বনাথ পৌর শহরের জানাইয়া (মশুল্লা) গ্রামের বিশ্বরূপ মডেল মন্দির প্রাঙ্গন থেকে রথ বের হলে তা পৌর শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বিপুল সংখ্যক ভক্ত-অনুসারীর অংশগ্রহণে উৎসব পরিণত হয় এক মহামিলনমেলায়।
এছাড়া উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের দিঘলী গ্রাম ও খাজাঞ্চী ইউনিয়নের মদনপুর গ্রামেও আয়োজিত হয় রথযাত্রা। নিরাপত্তা নিশ্চিতে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় কড়া ব্যবস্থা।
রথযাত্রার সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক সুনন্দা রায়, সিলেট ওসমানী মেডিকেলের মেডিসিন কনসালটেন্ট ডা. হিতাংশু শেখর রায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলাউদ্দিন কাদের, ওসি এনামুল হক চৌধুরী, শিক্ষক নবেন্দু জ্যোতি দে, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দসহ আরও অনেকে।
এদিকে একই দিনে শ্রীশ্রী শনি মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় চিত্রাঙ্কন ও কুইজ প্রতিযোগিতা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে পুরস্কার বিতরণ ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ইউএনও সুনন্দা রায়। মলয় সোম চৌধুরী ও একান্ত তালুকদার তুষারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সাংগঠনিক ব্যক্তিবর্গ।
একইদিন সকালে (২৭ জুন) বিশ্বনাথ হারায় এক মণীষাকে। উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের কিংবদন্তি বাউল সাধক, অগণিত মরমী গানের রচয়িতা ও সুরকার খোয়াজ মিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় দৌলতপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজ মাঠে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাঁকে।
৮৩ বছর বয়সী এই গুণী শিল্পী রেখে গেছেন ৫ পুত্র ও ৫ কন্যা। তাঁর লেখা এবং গাওয়া গানের প্রতিটি কলি বয়ে এনেছে মানুষের হৃদয়ের কথা—
"আমার ভয় লাগিলো মনেরে...",
"তুমি বিনে কেমনে থাকি একেলা...",
"আমার বন্দে মহা যাদু জানে..."—এমন অসংখ্য কালজয়ী গান তাঁকে করে তুলেছে অমর।
জানাজায় ইমামতি করেন মিয়ারবাজার মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল মুক্তাধির খান। অংশ নেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজ আরব খান, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আশিক, শিষ্য-ভক্তগণ ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ।
উল্লেখ্য, বাউল খোয়াজ মিয়া ছিলেন দুর্বিন শাহ’র শিষ্য ও মরমী সাধনায় দীক্ষিত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি জ্ঞানের সাগরে ডুবে থেকে সৃষ্টি করে গেছেন এক অনন্য ধারার বাউল সংগীত।
