মোঃ সবুজ মিয়াঃ সিলেটের আধ্যাত্মিক জনপদে বইছে ধানের শীষের জয়জোয়ার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কড়া নিরাপত্তা আর আধুনিক প্রযুক্তির নজরদারির মধ্যে সিলেটের ৬টি আসনের ৫টিতেই অভূতপূর্ব জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বিএনপি। মূলত শক্তিশালী প্রার্থী বাছাই, নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা এবং সাধারণ মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করেই এই ভূমিধস জয় পেয়েছে দলটি। একমাত্র সিলেট-৫ আসনটি ছাড়া বাকি সব কটিতেই ধানের শীষের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বীরা।
সিলেট-১: মুক্তাদিরের ‘মাস্টারস্ট্রোক’
সিলেটের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসনে ১৬ হাজার ৪৩৫ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বেসরকারি ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৩২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের হেভিওয়েট মাওলানা হাবিবুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮৩ ভোট। সাধারণ মানুষের সাথে নিবিড় যোগাযোগ এবং শেষ মুহূর্তের ‘গণজোয়ার’ মুক্তাদিরকে এই সহজ জয় এনে দিয়েছে।
সিলেট-২: লুনার ইতিহাস গড়া বিজয়
স্বামী ইলিয়াস আলীর উত্তরসূরি হিসেবে বিশ্বনাথ-ওসমানীনগরে ইতিহাস গড়েছেন তাহসিনা রুশদী লুনা। তিনি সিলেট-২ আসনের প্রথম নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলীকে (৩৮,৬৩৫ ভোট) ৭৯ হাজার ৩২১ ভোটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে ধানের শীষের দুর্গ পুনরুদ্ধার করেছেন তিনি।
সিলেট-৩: আব্দুল মালিকের নিরব বিপ্লব
সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মোহাম্মদ আব্দুল মালিক ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৫০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজু (রিকশা) ৭৩ হাজার ৬১৪ ভোট পেলেও আব্দুল মালিকের শক্ত অবস্থানের কাছে তা ম্লান হয়ে যায়।
সিলেট-৪: জয়নালকে ধরাশায়ী করলেন আরিফুল
সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট-কোম্পানীগঞ্জ-জৈন্তাপুরে ধানের শীষের জোয়ারে ভেসে গেছেন প্রতিদ্বন্দ্বীরা। আরিফুল হক চৌধুরী ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৬ ভোট পেয়ে বিশাল জয় পেয়েছেন। জামায়াতের জয়নাল আবেদীন (দাঁড়িপাল্লা) মাত্র ৭১ হাজার ৩৯১ ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন।
সিলেট-৬: সেলিম উদ্দিনকে হারিয়ে এমরানের চমক
গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা সেলিম উদ্দিনের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে জয় ছিনিয়েছেন বিএনপির এমরান আহমদ চৌধুরী। ১০ হাজার ৮৬৪ ভোটের ব্যবধানে সেলিম উদ্দিনকে পরাজিত করেন তিনি। এমরান পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৬১২ ভোট। তার নিকটতমী প্রতিদ্বন্দ্বী সেলিম উদ্দিন পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৭৪৮ ভোট।
সিলেটের ৫টি আসনে বিএনপি সরাসরি জয়ী হলেও সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে বিএনপির সমর্থনে লড়া জমিয়ত নেতা উবায়দুল্লাহ ফারুক পরাজিত হয়েছেন। এই আসনে ১১ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মুফতি আবুল হাসান (দেওয়াল ঘড়ি) জয়লাভ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের কেন্দ্রে আনার কৌশল এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত হওয়ায় ধানের শীষের এই গণজোয়ার ভোটে রূপান্তর হতে পেরেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর অবাধ ভোটের সুযোগ পেয়ে সিলেটের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষেই রায় দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সিলেটে বিএনপির এই ভূমিধস জয় রাজপথে নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।
সিটি/সমি/
