মোঃ লিমন আহমদঃ ‘সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী বিজয়ী হন, সেই দলই সরকার গঠন করে’-সিলেটের রাজনীতিতে প্রচলিত এই প্রবাদের বাস্তব রূপ দেখতে আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা বাকি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ক্ষণগণনা শুরু হতে না হতেই আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেট এখন নির্বাচনী জ্বরে কাঁপছে। বিশেষ করে ভিআইপি আসন সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) নিয়ে সারাদেশের মানুষের কৌতূহল তুঙ্গে।
ভোটের সমীকরণ ও ভোটার পরিসংখ্যান: মর্যাদাপূর্ণ এই আসনে এবার মোট ভোটার ৬,৬৬,৩৩০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩,৪২,৬৩৭ জন এবং মহিলা ভোটার ৩,২৩,৬৮০ জন। এছাড়াও রয়েছেন ১৩ জন হিজড়া ভোটার। মোট ২১৪টি কেন্দ্রে আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ৮ জন প্রার্থী। তারা হলেন: ১. খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির (ধানের শীষ - বিএনপি) ২. মাওলানা হাবিবুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা - জামায়াত) ৩. মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা - ইসলামী আন্দোলন) ৪. সঞ্জয় কান্ত দাস (কাঁচি - বাসদ-মার্কসবাদী) ৫. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (কাস্তে - সিপিবি) ৬. আকমল হোসেন (ট্রাক - গণঅধিকার পরিষদ) ৭. শামীম মিয়া (আপেল - ইনসানিয়াত বিপ্লব)
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের ভাষ্যমতে, লড়াই মূলত ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। তবে ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশকে ধানের শীষের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হতে দেখা যাচ্ছে। বিগত এক সপ্তাহে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেট নগরী ও সদর উপজেলার প্রতিটি কোণায় চষে বেড়িয়েছেন। ব্যবসায়ীদের সাথে গণসংযোগ, সচেতন নাগরিক সমাজের সাথে মতবিনিময় এবং তরুণ ভোটারদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মাঠ গরম করে রেখেছেন। তার ইশতেহারে ‘আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব সিলেট’ গড়ার স্বপ্ন ভোটারদের বড় একটি অংশকে আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ধানের শীষের জোরালো সমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমানের প্রচারণার ধরণ কিছুটা ভিন্ন। প্রকাশ্য সমাবেশের চেয়ে তিনি ওলামা-মাশায়েখ এবং মাদরাসা কেন্দ্রিক যোগাযোগে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। গোপন সূত্রের খবর অনুযায়ী, সিলেটের বিশাল আলেম সমাজ ও মাদরাসা ছাত্রদের বড় একটি অংশ মনেপ্রাণে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করছে। এছাড়া বড় একটি অংশ যারা ব্যক্তিগতভাবে বিএনপিকে অপছন্দ করেন বা জামায়াতের আদর্শের কাছাকাছি, তাদের ভোটও দাঁড়িপাল্লার বাক্সে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, ভোটের মাঠে একটি বড় অংশ ‘বাইরে ধানের শীষ কিন্তু মনে দাঁড়িপাল্লা’—এই নীতিতে এগোচ্ছে।
নিরাপত্তায় ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’ ও ডক-স্টেশন: ভোটগ্রহণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে সিলেটে এবার নজিরবিহীন প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকবে ‘বডি-ওর্ন ক্যামেরা’। সিলেট মহানগরীর একটি থানায় ইতোমধ্যে অত্যাধুনিক ডক-স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকে সরাসরি কেন্দ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মহানগরীর ২৯৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ৯৫টি কেন্দ্রকে ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ (ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য ২,২০০ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি বিজিবি, র্যাব ও স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন থাকবে। মহানগর পুলিশের কাছে ইতোমধ্যে ২৩৪টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা হস্তান্তর করা হয়েছে।
সিলেটের ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমান জানিয়েছেন, অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বডি-ওর্ন ক্যামেরার ফুটেজ ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, সিলেট জেলা পুলিশের আওতাধীন ১০৩টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত সিলেট। এখন শুধু অপেক্ষা ১২ ফেব্রুয়ারির সেই মাহেন্দ্রক্ষণের।
সিটি/লিআ/নিপ্র
